৩০ এর পর...

 

৩০ এর পর মানুষের কি যেন একটা হয়।
৩০ অবধি যেসব মানুষ "ধৈর্যশক্তি" নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় টিকে থাকত,নিজের সাথে লড়াই করত, ৩০ এর পর ঐ টিকে থাকাটা যেন ম্যান্ডেটরি লাগে না। ইচ্ছে হয় এবার নিজের জন্য যত্ন করতে।
বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাত চড়াই উতরাই পেরিয়ে নিজেকে ভেঙে ভেঙে যে মানুষটা আজ ও সারভাইভ করছে তার হঠাৎ খুব ক্লান্ত লাগতে শুরু করে। কাউকে কিছু বলতে ইচ্ছে করে না, নিজেকে গুটিয়ে রাখতে শুরু করে। হাতে গোনা কয়েকটা বন্ধু। আর যারা বন্ধুরুপী, এক সেকেন্ডে তাদের সরিয়ে দিতেও বুক কাপে না এখন আর। আসলে এতো আজেবাজে জিনিস বছরের পর বছর "সহ্য" করার পর তার অজান্তেই "সহ্যশক্তি" কমে আসে। মনেহয়, "আর কত? কেনই বা নেবো? আমি কি পেলাম? যা পাচ্ছি তা আমার কেন দরকার হচ্ছে? আমার দরকারের উৎসটা কেনো বেঁধে রেখে আমায় সাহায্যের নামে আটকে রাখা হচ্ছে? এটা কি আমি না অন্য কেউ? এ কি ভালোবাসা না ভালবাসার নামে কোনো বন্ধন?" স্বার্থহীনতাকে বোকামো বলে মনেহয় এতোগুলো বছর পর।
কুয়াশা কাটতে থাকে বেলা বাড়লে....
কিছু মানুষকে চেনা যায় যারা বড়ো যত্ন দেখায়, হ্যা ঠিক পড়ছেন "দেখায়"। সত্যিই পাশে থাকে না। ঐ যত্নের ইলিউশনের ঠ্যালায় আপনার এক্সপেকটেশন হয়ে যায়, কিন্তু প্রতিবার এক্সপেকটেশনের গলা টিপে বোঝানো হয় এক্সপেক্ট করতে নেই। আপনিই ভুল। তবে যত্ন দেখানোর প্রয়োজন কার? অবশ্যই যে দেখাচ্ছে তার। তার নিজের কাছে ক্লিন থাকার প্রয়োজন, মিষ্টি দুটো কথায় কাউকে বেঁধে রাখার প্রয়োজন নিজের স্বার্থে। যত্ন যে লাউড না, দেখানোর না, পরম যত্নে আগলে রাখা তার ব্যবহারে, কাজে। এই বয়সে না বোঝার মতন না আর।
আবার কুয়াশা কাটতে থাকে বেলা আরেকটু বাড়লে....
আরো কিছুটা বেলা বাড়লে আপনি বুঝবেন, মানুষ চায় আপনি "থাকুন", কিন্তু আপনাকে রাখার মতন জায়গা তারা করতে চায় না। হ্যা আবার পড়ুন, "চায় না"। তাই টেম্পোরারি কিছু খেলনা আর পার্কে নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার মতন ভালোবাসা দিয়ে ভুলিয়ে রাখে আপনাকে। মানুষ 'আপনি জাস্ট থাকুন' এটা চায় নিজের কারণেই, আপনার কারণে না। তাই একবার বুকে পাথর রেখে হালকা করে সামান্য বেরিয়ে এসে দেখুন দেখুন ঠিক আরেকজন আপনার জায়গায় বসেগেছে কয়েকদিনেই। আর আপনি ভাবছেন এ আপনাকে ছাড়া কিচ্ছু পারবে না, মানে যা আপনাকে উপর উপর বোঝানো হয়েছিল আর কি। আপনার ভালোথাকা নিয়ে ভাবেনি তো কেউ। বাধ্য করেছে সরে যেতে।
আপনার ভালো বোধ না করাটা হয়তো আপনাকের অপশনাল বা টেকেন ফর গ্র্যান্টেড ট্রিট করাটা দিয়েই শুরু হয়, আপনার স্ট্রং ইন্টিউশন সিগন্যাল দিতে শুরু করে তখনই!
আরো আরো কুয়াশা কাটতে থাকে বেলা আরেকটু বাড়লে....
বেসিকেলি তখনি একটা অনুভূতি আসে, যেটা স্বীকার করতে আমাদের অবস্থা খারাপ হয়ে যায়,
"আমার জন্য কেউ ভাবার রইলো না।" 😊
এটা বোল্ডলি ফেস না করে মানুষ আবার ইলুউশন খুঁজতে নামে।
আবার আঘাত পায়।
এটা জীবনের কঠিনতম খেলা। এটা ফেস করতে করতে করতে, একদিন আপনি হঠাৎ স্বাধীন হয়ে যাবেন। দেখবেন মাথার ভিতরে ঐ ব্যাথা আর নেই। মৃত্যুভয় নেই, বাঁচার ভয় ও নেই, দিশেহারা লাগছে না আর, ইলিউশনে ঝাঁপাচ্ছেন না আর। অনেক শান্ত, ধীর। আরো কয়েক ধাপ অদম্য শক্তি। চারিদিক আলো, অদ্ভুত আলো। দিনের ওপারেও কি কিছু অপেক্ষা করছে যা দেখা যায় না এক্ষুনি?!
কুয়াশা কেটে রোদ উঠছে এবার
ছোটোথেকে বোঝানো কত মিথ্যে, কত অসহায় বোধ করানোর মানুষগুলো অচেনা একটা মেয়েকে দেখতে শুরু করে। আপনার আর কাঠগড়া থেকে নামার ইচ্ছে জাগে না।
বরং এবার আপনি বলছেন, "আসুন আপনারা একে একে আমায় বিচার করতে। বিচার হয়ে গেলে চলে জান পরের দলকে জায়গা করে দিন।দলে দলে আসবেন, ভীড় বাড়াবেন না জায়গা কম, পাছে আপনাদের আদালত ভেঙে না পড়ে।"
আসলে চারিদিকে একা লড়তে লড়তে ৩০ এর পর মনেহয় নিজের স্বপ্ন, ইচ্ছে, ভালোবাসা, সম্মান, বিশ্বাস এগুলো বিক্রির সত্যি দরকার নেই। কুয়াশা কাটতে থাকে আরো একে একে। চারিদিকে কত চেনা কত পুরোনো মুখ্ বেরিয়ে আসে তাদের হীনমন্যতায় ভোগা হিংসে নিয়ে, বারবার আমায়/আপনাকে টেনে নামাতে চায়। দুঃখ হয় পান বিশ্বাস করেছেন ভেবে। ভালোবেসেছেন ভেবে।
অদ্ভুত লাগে দেখে যে, এবার আর ঝগড়া করাটাও যেন আসে না।
বিগত ৩০ বছরে অন্যের কাছে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা, নিজের অবস্থান ধরে রাখার আকুল আর্তি, পাশে কাউকে না পাওয়ার পরেও স্বাধীনচিন্তা যা কোনোভাবেই ক্ষতিকারক নয় সেসব নিয়ে একের পর এক লড়াই একা চালিয়ে যাওয়া যে কি ভয়ঙ্কর, সে চেষ্টাও যেন কমে আসে দিনে দিনে।
নাম্ব লাগে সবেতেই। কে থাকলো, কে গেলো হিসেব থাকে না আর। বারবার মনেহয় ময়দানে বসে থাকা সেই সর্বহারার কিছুই যে হারানোর থাকে না, তাও সে নিজের থেকেই কাক কে খাওয়ায়। নিজের যতটুকু অভিজ্ঞতা শেয়ার করলে যদি কারোর একটা হেল্প হয়।
কোনোকিছুতেই অতিরিক্ত আনন্দ যখন আপনার হবে না তখন বুঝবেন জীবন ব্যালান্স শিখছে, দুঃখের মাত্রাও তখন অনেক কমে আসে। সেই যে বাঁচছি বলে মনেহওয়া দিনগুলো দেখুন সবথেকে বেশি কষ্ট দিয়েছে জীবনে। বেঁচে থাকা আর তাকিয়ে থাকার মধ্যে খুব বেশি তফাৎ পাবেন না আর। ডিটাচমেন্ট শুরু হয় সবকিছুর থেকে। এ এক অদ্ভুত শান্তি।
রাত নামে।
পরিষ্কার আকাশে জ্বলজ্বল করে ধ্রুবতারা। ধীর, স্থির, জ্বলন্ত।
আপনার মতোই।
- শ্রীজয়ী

Comments